কুমিল্লা
সোমবার,১২ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৮ পৌষ, ১৪৩২ | ২২ রজব, ১৪৪৭
শিরোনাম:

‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত’ অঙ্গীকারনামায় সীমাবদ্ধ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রথম ব্যাচে ভর্তি ফরম ও রেজিস্ট্রেশন ফরমে অঙ্গীকারনামায় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার অঙ্গীকার নেওয়া হয়। রাজনীতির পাশাপাশি ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ও আবাসিক হলগুলোতে বসে মাদকের আসর।

ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষক রাজনীতিও সরব। অঙ্গীকারনামায় এসব নিষিদ্ধ থাকলেও ক্যাম্পাসে এর প্রভাব দেখে বিস্মিত বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সদস্যরা।

সূত্র মতে, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩ত তম ব্যাচ চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর প্রথম ব্যাচ থেকেই ভর্তি ফরম ও রেজিস্ট্রেশন ফরমে অঙ্গীকারনামায় রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ার অঙ্গীকার নেওয়া হয়।

যে অঙ্গীকার বর্তমান ফরমগুলেতেও বলবৎ আছে। অঙ্গীকারনামার প্রথমেই উল্লেখ রয়েছে,“আমি এই মর্মে অঙ্গীকার করছি যে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি মেনে চলতে সচেষ্ট থাকবো।” কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এর চিত্র সম্পূর্ণই আলাদা। যেখানে রাজত্ব সব ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।

এ ক্যাম্পাসটিতে ছাত্র রাজনীতির প্রভাব বিস্তার করছে সর্বত্র। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দই নিয়ন্ত্রণ করে আবাসিক হলগুলো। এমনকি ছাত্র রাজনীতির নিয়মিত কর্মকান্ডে যোগদান না করলে মিলে না হলগুলোতে সিট।
২০১১ সালে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের আহবায়ক কমিটি দেওয়া হয়।

২০১৫ সালের ২৪ জুলাই ১০ সদস্য বিশিষ্ট প্রথম কমিটি ঘোষণা করা হয়। যার সভাপতি ছিল নাজমুল হাসান আলিফ ও সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী। বর্তমানে ছাত্রলীগের ২য় কমিটি চলছে। পূর্নাঙ্গ এ কমিটির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক রেজাউল ইসলাম মাজেদ। এ কমিটি দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ২৬ মে। এ কমিটির মেয়াদও দেড় বছর আগে শেষ হয়েছে।

ছাত্রলীগের সহিংস রাজনীতি ও দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণেই ২০১৬ সালের ১ লা আগস্ট দু’গ্রুপের সংঘর্ষে দলীয় কর্মীদের দ্বারাই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম হল শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি হলেও আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। শুধু সাইফুল্লাহ হত্যাই নয় ছাত্রলীগের নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মারামারির ও সংঘর্ষের ঘটনা রয়েছে অসংখ্য। ২০১৫ সাল থেকে শাখা ছাত্রলীগের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নিজ দলীয় নেতাকর্মীদেরসহ সাধারণ শিক্ষার্থীরা মারধরের শিকার হয়েছে প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী। মারধরের ঘটনা ঘটেছে প্রায় শতাধিক।

এসব মারধরের বিচার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ জানানোর পরেও একটি ঘটনারও বিচার করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে শিক্ষক লাঞ্ছনা, সাংবাদিকদের মারধর ও লাঞ্ছনা, দলীয় নেতাকর্মীদের মারধর, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ থাকলেও বিষয়গুলো বারবারই এড়িয়ে গেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে ছাত্রলীগ থেকে আজীবন, সাময়িকসহ বিভিন্ন মেয়াদে বহিস্কার করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছিল নিরব। এমনকি প্রশাসনের কাছে বিচার দিলে ছাত্রলীগের সাথে বসে সেগুলো মিমাংসা করতেও বাধ্য করতো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

তাই অনেকে মারধরের শিকার হয়েও মুখ খুলতে পারতো না। শুধু তাই নয় বিচারের আশ্বাস দিয়ে ডেকে এনে আবারও মারধর করার অভিযোগ রয়েছে শাখা ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে।
অপরদিকে শাখা ছাত্রদলের কমিটি থাকলেও তাদের নেই কোন কার্যক্রম। মাঝে মাঝে ক্যাম্পাসের দিকে তাদের অবস্থান করার চেষ্টা করলেও ছাত্রলীগের কারণে তা ব্যর্থ হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন বিভাগের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী নতুন কুমিল্লা.কমকে বলেন,‘আমরা ক্যাম্পাসে ভর্তি হই একটি রাজনীতি ও ধূমপান মুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে। কিন্তু ভর্তির পরেই তা ভঙ্গ করতে হয় আমাদের। আবাসিক হলগুলোতে যেখানে থাকবে পড়াশুনা করার একটি সুষ্ঠু পরিবেশ সেখানে হল ছাড়তে বাধ্য হয় পড়াশুনা করার জন্য। হলে সিনিয়র হয়েও যেখানে সিট পাওয়া যায় না সেখানে রাজনীতির আধিপত্যে প্রথম দিন উঠেই পেয়ে যায় সিট।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষার্থীরা আরও নতুন কুমিল্লা.কমকে জানান, হলগুলোতে মাদকের আগ্রাসন এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে এখান থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারছে না। এ বিষয়ে হল প্রশাসন একেবারেই উদাসীন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে না আসলে বুয়েটের আবরার হত্যার মতো ঘটনা ঘটা তেমন কোন বিষয় হবে না বলে আশঙ্কা শিক্ষার্থীদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক নতুন কুমিল্লা.কমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কোথাও রাজনীতির প্রভাব ব্যাতীত নেই। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় তো আর তার বাহিরে নয়। তারপরেও এখানে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি যে প্রকট আকার ধারণ করেছে সেটা ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরুপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, প্রভোস্টবৃন্দও যেখানে ছাত্রলীগে নেতাদের কথার বাহিরে যেতে পারে না সেখানে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থী তো কিছুই না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জিম্মি হয়ে আছে বলেও হতাশা প্রকাশ করেন বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমরান কবির চৌধুরী নতুন কুমিল্লা.কমকে বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বের অবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইলেই একবারে সম্ভব না। বিষয়গুলো নিয়ে আমরা শিক্ষক, ছাত্রনেতা এবং শিক্ষার্থীদের সাথে বসে একটা সমাধানে আসবো। যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাদের আধিপত্যই ক্যাম্পাসে দেখা যায়। এটা একটা রীতি হয়ে গেছে ক্যাম্পাসগুলোতে। যদি ছাত্রনেতারা একসাথে ২০-২৫ জন এসে কোন বিষয়ে চাপ দেয় সেখানে আমারও তো তেমন কিছু করার থাকে না।

আরও পড়ুন