- স্কুল-কলেজে পরিদর্শনের নামে চলছে ঘুস বাণিজ্য
- শিক্ষকদের এমপিওভুক্তি করতে জনপ্রতি নেওয়া হয় ৩-৫ হাজার
- অনারিয়ামে নামে নেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা
- অফিসের বাইরে জসীম, ভেতরে মাহবুব
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাউশির কুমিল্লা অঞ্চলের অধীনে রয়েছে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর জেলা। কুমিল্লা আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক অধ্যাপক মো. শহিদ উল্লা মজুমদার। তিনি এই কার্যালয়ে যোগ দিয়েছেন সাড়ে তিন মাস আগে। কিন্তু তার যোগ দেওয়ার পর থেকে শুরু হয়েছে ঘুস নেওয়ার উৎসব।
চলতি মাসে শুরু করেছেন বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন। আর পরিদর্শনের নামে শুরু করেছেন ঘুস বাণিজ্য। এতে আতঙ্কে রয়েছেন চার জেলার মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ প্রধানরা। প্রধানের এই ঘুস বাণিজ্য নিয়ে বিব্রতবোধ করছেন কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও।
অফিসের বাইরে তিনি সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে দিয়ে ঘুস আদায় করেন। এছাড়া অফিসে ঘুস আদায় করেন গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে দিয়ে। এই নিয়ে শিক্ষক সমাজে চলছে তীব্র সমালোচনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১১ অক্টোবর পরিচালক মো. শহিদ উল্লা মজুমদারের নেতৃত্বে উপ-পরিচালক মোহাম্মদ সফিকুর রহমান, গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম ও সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন লাকসাম- মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে যান। প্রথমে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পরিচালক বকাবকি শুরু করেন। প্রতিষ্ঠান প্রধানকে বিব্রত করার পর পরবর্তীতে সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে দিয়ে অনারিয়ামের নামে ঘুস চান। ‘আ’ আদ্যক্ষরের প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার চাওয়া হয়। প্রতিষ্ঠান প্রধান তাৎক্ষণিক ২০ হাজার টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা সহসা পরিশোধ করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। ‘ন’ আদ্যক্ষরের প্রতিষ্ঠান প্রধান দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা ঘুস। ‘ব’ আদ্যক্ষরের প্রতিষ্ঠান প্রধানও দিয়েছেন ১০ হাজার টাকা।
এছাড়া বরুড়া উপজেলায় যাওয়ার আগে ফোনে জানানো হয়, ১০ হাজার টাকা করে অনারিয়াম রাখতে। অনিয়ম থাকলে সেই রেট আরও বাড়বে। বেশি হৈ চৈ করেছেন লাকসামের গণ উদ্যোগ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে। এনিয়ে চার জেলার ২৯৩টি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং কলেজের প্রধানদের মাঝে সমালোচনা ঝড় বইছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুটি কলেজের অধ্যক্ষ ও একটি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, দীর্ঘ চাকরি জীবনে এমন পরিচালক দেখিনি। কোনো তদন্ত নেই, কাগজপত্র দেখার নাম নেই, এসেই দুর্ব্যবহার। তারপর শুরু হয় সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে দিয়ে অনারিয়ামের নামে ঘুস চাওয়া। চাকরি করি, তাই বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছে।
তারা আরও বলেন, পরিচালক ২০০৭ সালে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে উপ-সচিব (একাডেমিক) পদে কর্মরত ছিলেন। সেখানেও তিনি নানা অনিয়মে জড়ান। মাউশিতে আসার পর তিনি বলে বেড়াচ্ছেন ২০ লাখ টাকা খরচ করে এসেছেন। খরচতো তুলতে হবে।
লাকসামের গণ উদ্যোগ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের দাতা সদস্য আবুল কালাম মজুমদার বলেন, আমাদের একজন শিক্ষককে দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণসহ বিভিন্ন অনিয়মে বহিষ্কার করে ম্যানেজিং কমিটি। এনিয়ে তারা তদন্তে আসেন। পরিচালক মো. শহিদ উল্লা মজুমদার কাগজপত্র না দেখে অধ্যক্ষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। এছাড়া তিনি শিক্ষকদের সামনে তাকে নিয়ে কটূক্তি করেন, অথচ আমাদের প্রতিষ্ঠান জেলার সেরা প্রতিষ্ঠান। এক পর্যায়ে এক কক্ষে শিক্ষকদের নিয়ে স্কুলের পরীক্ষার মতো পরীক্ষা নেন। এমন তদন্ত কখনো দেখিনি।
বিকেল সোয়া ৩টার দিকে শহিদ উল্লা মজুমদারসহ মোট ৪ জন লোক আমাদের প্রতিষ্ঠানে আসেন। তারা সেখান থেকে সন্ধ্যা ৭টায় বের হন। শেষে সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে দিয়ে আমার সামনে অধ্যক্ষের নিকট ঘুস চান। প্রথমে ৩২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে আমরা অস্বীকৃতি জানালে জসিম উদ্দিন বলেন, আরেক প্রতিষ্ঠান ৩২ হাজার টাকা দিয়েছে, আপনারাও সেটা দেন। এক পর্যায়ে বলেন, আমরা চারজন ২০ হাজার টাকা দেন। আমাদের সভাপতি ফোনে ঘুস চাওয়ার বিষয়টি তাকে জিজ্ঞেস করেন। তিনি বলেন টাকা চেয়েছি, তবে দিয়ে তো দেয়নি।
এদিকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, শিক্ষকদের এমপিওভুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিজন ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন। গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে দিয়ে এই টাকা আদায় করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসআপে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম বলেন, কোনো ঘুস বাণিজ্যের সঙ্গে আমি জড়িত নয় এবং আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সত্য নয়।
কুমিল্লা আঞ্চলিক পরিচালক মো. শহিদ উল্লা মজুমদার বলেন, আমার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা সঠিক নয় এবং আমার নাম ব্যবহার করে যদি অফিসের কেউ এই কাজ করে থাকেন প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সূত্র: জাগো নিউজ




